রবিবার, ২৭ মার্চ, ২০১১

Palestinian poet Mahmud Darwish and his poems/translated by gazi saiful islam


 ফিলিস্তিনের জাতীয় কবি মাহমুদ দারবীশের কবিতা

গাজী সাইফুল ইসলাম

জন্ম  এবং কবি হিসেবে আবির্ভাব:
মাহমুদ দারবীশ ১৩ মার্চ, ১৯৪১ ফিলিস্তিনের পশ্চিম আক্কুর গ্যালিলির আল বিরওয়ায় জন্মগ্রহণ করেন বর্তমানে তাঁর জন্মস্থান ইসরাইলের দখলিকৃত এলাকায়, যা ১৯৪৮ সালে আরব-ইসরাইল যুদ্ধের সময় ইসরাইল দখল করে নেয় সে সময় ইসরাইলি সেনাবাহিনী তাঁদের গ্রামটি ধ্বংস করে দেয় এবং ওই ধ্বংসাবশেষের ওপর গড়ে তুলে ইহুদিদের বাসস্থান সে সময় চলমান হত্যাকাণ্ড থেকে বাঁচার জন্য দারবীশের পরিবার সেই গ্রাম তথা ইসরাইল ছেড়ে পালায় এবং উদ্বাস্তু হিসেবে লেবাননে পাড়ি জমায় কবির বয়স তখন মাত্র সাত সুন্নি মুসলিম পিতামাতার আট সন্তানের মধ্যে দারবীশ দ্বিতীয় তাঁরা ছিলেন পাঁচ ভাই, তিন বোন লেবাননে এক বছর উদ্বাস্তু জীবন কাটিয়ে তাঁরা আবার গোপনে ইসরাইলে প্রবেশ করেন বর্তমানে তাঁর পরিবার দায়ার আল আসাদ নামক স্থানে অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু হিসেবে বসবাস করছে
দায়ার আল-আসাদেই মাহমুদ দারবীশ প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন কিন্তু বরাবরই অত্যন্ত ভয়ের মধ্যে দিন যাপন করতে হয়েছে তাঁদের, এমন ভয়ে যে, যে কোনো সময় ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ তাঁদের দেশ ত্যাগে বাধ্য করতে পারে উচ্চ মাধ্যমিকের পড়াশোনা শেষ হলে মি. দারবীশ স্ব-উদ্যোগে হাইফায় চলে যান­ - সাংবাদিকতার কাজ করার জন্য ওই সময় তিনি বিভিন্ন পত্রিকা ম্যাগাজিনের (যেমন আল-ইতিহাদ, আল-জাদিদ) জন্য কবিতা এবং বিভিন্ন বিষয়ের ওপর আর্টিক্যাল লিখতে শুরু করেন বলা আবশ্যক যে, দখলদার ইসরাইলিদের বর্বর অত্যাচারে বার বার পালিয়ে বেড়ানো বিঘ্নসংকুল উদ্বাস্তু জীবন কবিকে দান করে প্রতিবাদী এক দৃষ্টি চিন্তাশক্তি ফলে অপরাপর আরব কবিদের কবিতার মতো তাঁর কবিতায় স্রষ্টা প্রেমের মৃদু গুঞ্জরণের বদলে উঠে আসে তীব্র প্রতিবাদ কখনো সেটা সরাসরি কখনো রূপকের আকারে এবং শেষমেশ তাঁর কবিতাই আরবদের দেশ প্রেমের সংগ্রামের ভাষা হয়ে উঠে





১৯৬০ সালে বের হয় দারবীশের প্রথম কবিতার বই, আসাফির বিলা আজনিহা (উইংলেস বার্ড - পালকহীন পাখি), কবির বয়স তখন  মাত্র ১৯ এরপর ১৯৬১ সালে তিনি ইসরাইলি কমিউনিস্ট পার্টি দি রাকায় যোগ দেন এবং একই সঙ্গে আল- ফেইয়ার-এর সহ-সম্পাদক নিযুক্ত হন এরইমধ্যে কবিতা লেখা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ গ্রহণের জন্য কয়েকবার গ্রেফতার হন, গৃহবন্দি হন আইডেন্টি কার্ড কবিতা রচনার মাধ্যেমে ১৯৬৪ সালে তিনি আবির্ভূত হন ফিলিস্তিনি বিপ্লবী সংগঠনের প্রধান কণ্ঠস্বররূপে| ২২ বছর বয়সে প্রকাশিত হয় তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ অরাক আল যয়তুন (লিভস অব অলিভস- জলপাইয়ের পাতা) তাঁর আইডেন্টি কার্ড কবিতাটি তখন শুধু ফিলিস্তিনে নয় সমগ্র বিশ্ব জুড়ে বিপ্লবীদের মুখে মুখে ছিল
শুনে রাখো!
আমি একজন আরব
আমার পরিচয় পত্রের নাম্বার পঞ্চাশ হাজার
আট সন্তানের জনক আমি
এবং নবম সন্তান আসছে পরের গ্রীষ্মে
তোমার কি হিংসে হচ্ছে?
শুনে রাখো!
আমি একজন আরব
কোনো উপাধি ছাড়াই চলে আমার নাম
লড়ছি দেশের জন্য
লোকেরা সেখানে ফেটে পড়ছে ক্রোধে
প্রবাস জীবন:
১৯৭১ সাল পর্যন্ত মাহমুদ দারবীশ ইসরাইলি কমিউনিস্ট পার্টি দি রাকা সঙ্গে যুক্ত থাকেন কিন্তু সামনের দিনগুলোতে আরও বেশি বিপদের আশঙ্কা দেখা দেয়ায় ১৯৭১ সালেরই শেষের দিকে তিনি মস্কো চলে যান মস্কো থেকে আসেন কায়রো কায়রো এসে তিনি দৈনিক আল-এহরাম পত্রিকায় যোগ দেন পরে ১৯৭৩ সালে আবার বৈরুতে আসেন এবং মাসিক শোয়ুন ফিলিস্তিনিয়া (ফিলিস্তিনি অ্যাপেয়ারস) পত্রিকার সম্পাদক হন এবং নিযুক্ত হন পিএলও-এর গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক ১৯৮১ সালে তিনি সাহিত্য সংস্কৃতি বিষয়ক ম্যাগাজিন পাক্ষিক আল-কারমেল-এর(যা আগে নিকোশিয়া থেকে প্রকাশিত হতো) প্রধান সম্পাদক হন ১৯৮২ সালের গ্রীষ্মে বৈরুত আক্রান্ত হয়, ১৩ জুন থেকে ১২ আগস্ট পর্যন্ত চলে বোমা হামলা অবস্থায় পিএলও-এর সদর দপ্তর শহরের বাইরে স্থানান্তরিত হয় একই বছর অর্থাৎ ১৯৮২ সালেই প্রকাশিত হয় তাঁর বিদায় বৈরুত (কাসিদাত বেইরুত) এবং ১৯৮৩ সালে মাদিহ্‌ আল-যিল আল-আলি কাব্যগ্রন্থ ১৯৮৭ সালে দারবীশ পিএলও-এর এক্সিকিউটিভ নির্বাচিত হন 
পরে ১৯৯৫ সালে ইংরেজিতে অনূদিত তাঁর ভুলে যাওয়া স্মৃতি কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হলে ওই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো ফিলিস্তিনি বিপ্লবের বার্তা বিশ্ব জুড়ে তীব্রভাবে তুলে ধরে, যার ফলে আবার তাঁকে নির্বাসনে যেতে হয় এবার প্রথমেই যান কায়রো, পরে তিউনিসে এবং ওখান থেকে প্যারিসে  ১৯৯৮ সালে একটি কবিতায় তিনি লিখলেন,
সুতরাং ছেড়ে যাও আমাদের ভূমি
আমাদের সৈকত
আমাদের সমুদ্র
আমাদের গমক্ষেত
আমাদের বুদ্ধির জগৎ
আর হৃদয়ের মর্মমূল...

ফিলিস্তিনি বিপ্লবী কবি:
রচিত কবিতার জন্যই মাহমুদ দারবীশকে বিপ্লবী কবি (দি পয়েট অব দি রেজিসটেন্স) বলা হয়ে থাকে কেউ কেউ অবশ্য বলে অভিযোগ করেন যে, তাঁর লেখা ফিলিস্তিনিদের মূলধারার রাজনীতির রক্ষা কবচ হিসেবে বিবেচিত হয় কিন্তু দারবীশ তাঁর নিজের সম্পর্কে একেবারেই উদাসীন তিনি কে, কী, কিংবা কী হতে চান এমন যে কোনো ধরনের চূড়ান্ত প্রশ্নের উত্তর তিনি এখনো সযত্নে এড়িয়ে যান তিনি ১৯৮৮ সালে ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতার ঘোষণা পত্র এবং এমন কিছু বিপ্লবী কবিতা রচনা করেন - যেগুলো প্রতিটি আরবের চেতনায় গাঁথা হয়ে যায় প্রেমের কবিতার পাশাপাশি মৃত্যু বিষয়ক কবিতাও  তিনি অনেক লিখেছেন তাঁর কবিতার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য সহজবোধ্যতা একবার তিনি বলেছিলেন, যখন আমি শুদ্ধ কবিতার নিকবর্তী হই, ফিলিস্তিনি পাঠকরা তখন বলেন, আপনি যা ছিলেন সেখানে ফিরে যান কিন্তু অভিজ্ঞতা থেকে আমি শিখেছি যে, আমি আমার পাঠকদের সঙ্গে নিতে পারি যদি তারা আমাকে বিশ্বাস করেন আবার আমি আধুনিকতাও সৃষ্টি করতে পারি এবং খেলতেও  পারি ইচ্ছেমত যদি আমি শুদ্ধ থাকি (নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর সঙ্গে সাক্ষাৎকার) কবি দারবীশের এসব কথার সততা মিলে নিচের উদ্ধৃতি থেকে তিনি লিখেছেন,
যখন আমি আমার নিজেকে খুঁজি - অন্যদের পাই
এবং যখন অন্যদের খুঁজি
তখন কেবলই পাই আমার অলৌলিক পরম সত্তা
সুতরাং আমি কি একটি স্বতন্ত্র -ভিড় ?
(ম্যুরাল)
আরব ভাষায় তিনি নিজের জন্য এমন একটি এলাকা প্রতিষ্ঠা করেছেন যার জন্য বলা যায় - ভাষাই তাঁর রাজ্য একজন প্রখ্যাত আরব সমালোচক লিখেছেন, মাহমুদ দারবীশ হলেন আরবি ভাষার রক্ষাকর্তা তিনি কবিতায় যে সব প্রতীক, রূপক ব্যবহার করেন এসবের জন্য আলাদা সতর্কতা তাঁর থাকে এবং তাঁর রচনা শৈলীও স্বতন্ত্র| একই সঙ্গে নান্দনিকতায় উত্তীর্ণ সুদূর প্রসারি দৃষ্টির কারণে তাঁর কিছু কবিতকে বলা হয় ভবিষ্যৎ-প্রবক্তা এমন  শৈল্পীক প্রজ্ঞা এবং অসাধারণ রাজনৈতিক জ্ঞান খুব কম কবির কবিতায় দেখা যায়
ফিলিস্তিনিয়ান ইন্তিফদার সংগ্রামকে জয়যুক্ত করার জন্য কবি সমপ্রতি তাঁর বেশিরভাগ সময় অবরুদ্ধ রামাল্লায় কাটাচ্ছেন অবস্থায় তিনি সমপ্রতি তিনটি অসাধারণ বিপ্লবী কবিতা রচনা করেছেন অবশ্য সব কবিতা তাঁর আগের কবিতার কিছু পরিবর্তিত রূপ কবিতাগুলো হলো মাহমুদ, দি স্যাক্রিফাইস, এবং স্টেট অব সিজ কবিতাগুলো আরবি ভাষার একটি কাব্যগ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছে এটি দারবীশের ২১তম কাব্যগ্রন্থ শেষ কবিতাটিতে অবরুধদ্ধ রামল্লাকে তিনি পটভূমি করেছেন ওখানকার প্রত্যাহিক জীবনের ঘটনাবলী বহুভাবে জীবন্ত হয়ে উঠেছে কবিতাটির পংতিতে পংতিতে 
তিনি লিখেছেন:
***
একজন মহিলা মেঘকে বললেন, ঢেকে দাও আমার ভালোবাসা
তার রক্তে ভিজে গেছে হিজাব আমার
***
যদি তুমি না পারো বৃষ্টি হতে, আমার ভালোবাসা
বৃক্ষ হও
পরিপূর্ণ হও উর্বরতার দ্বারা, বৃক্ষ হও
যদি তুমি না পারো বৃক্ষ হতে, আমার ভালোবাসা
পাথর হও
সুসিক্ত হও আদ্রতার দ্বারা, পাথর হও
যদি তুমি না পারো পাথর হতে, আমার ভালোবাসা
চাঁদ হও
একজন রূপসী রমনীর কল্পনায়, চাঁদ হও
(একজন মহিলা বললেন তার ছেলের
শেষকৃত্যের সময়।)

১৯৯৩ সালে অসলো শান্তি চুক্তির প্রতিবাদে মাহমুদ দারবীশ পিএলও-এর এক্সিকিউটিভ কমিটি থেকে পদত্যাগ করেন পরে তিনি কমিটির উদ্দেশ্যে তিনি বলেছিলেন, আমি চেয়েছিলাম প্রমাণ হোক আমি ভুল করেছি কিন্তু আমি খুবই দুঃখিত যে আমার ধারণাই সঠিক ছিল
১৯৯৫ অসুস্থ মাকে দেখার জন্য একটি ভিসা নিয়ে ইসরাইলে প্রবেশ করার আগ পর্যন্ত তিনি প্যারিসে বসে আল কারমেল সম্পাদনা করেন বন্ধু লেখক এমিল হাবিবের মৃত্যুর পরে তাঁর শেষকৃত্যে অংশ গ্রহণের জন্য দ্বিতীয়বার তাঁকে ইসরাইলে প্রবেশ করতে অনুমতি দেয়া হয় এবং খুবই কম দিনের নিজের জন্য শহর বাড়ি পরিদর্শনের অনুমতি দেয়া হয় এরপর আরেকটি অনমুতিপত্রে তাঁকে দেশে থাকারও সুযোগ দেয় ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ বর্তমানে তিনি ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরের শহর রামাল্লায় আল কারমেল-এর  সম্পাদনার কাজে নিয়োজিত উল্লেখ্য যে, পিএলও তথা ইয়াসির আরাফাতের সদর দপ্তরও ছিল এই রামামল্লাতেই ২০০২ সালে শহরটি যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল
মার্চ ২০০০-এর মধ্য ভাগে ইসরাইলের শিক্ষামন্ত্রী উসি সারিদ ঘোষণা দিয়েছিলেন, মাহমুদ দারবীশের কিছু কবিতা তাদের উচ্চ বিদ্যালয়ের পাঠক্রমের অন্তর্ভূক্ত করা হবে তিনি তার দেশে শিক্ষাদানের জন্য দারবীশের সেই বিখ্যাত কবিতাটি পছন্দ করেছিলেন যাতে জেলখানায় অবস্থানের কারণে মায়ের হাতের কফি রুটি থেকে তিনি বঞ্চিত হচ্ছেন যাতে রয়েছে তাঁর মায়ের স্মৃতিচারণ খবর প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে ইহুদি রাষ্ট্রটিতে এর প্রতিবাদের ঝড় ওঠেছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী  ইহুদ বারাক বলেছিলেন, মাহমুদ দারবীশের কবিতা পাঠ্য করার উপযুক্ত সময় এটা নয় আর ইসরাইলি রাজনীতিবিদগণ বলল, মাহমুদ দারবীশের অন্যান্য কবিতায় ইহুদিদের প্রতি স্পষ্ট বিরোধিতা রয়েছে এরপরও তাঁর কিছু কবিতা তারা ঐচ্ছিক বিষয়ের আওতাভুক্ত করেছিল এবং এখন পর্যন্ত তা পাঠ্যসূচী বলবত আছে
বর্তমানে মি. দারবীশ সময় ভাগ করে রামাল্লাহ এবং আম্মানে বসবাস করছেন যদিও তিনি ইসরাইলি ভূ-খণ্ডে জন্মগ্রহণ করেছিলেন কিন্তু বর্তমানে তিনি ফিলিস্তিনের সম্মানীয় জাতীয় কবি দখলদার ইসরালিদের বর্বরতায় দুর্ভোগে নিপতিত লক্ষ লক্ষ ফিলিস্তিনি আরবের জন্য নিরলস লিখে যাচ্ছেন তিনি
২০০০ সালে প্রকাশিত হয় মাহমুদ দারবীশের ১২তম কাব্যগ্রন্থ, ম্যুরা এটি একটি মহাকাব্য অনেকেই তাঁর কাব্যগ্রন্থটিকে মাস্টারপিস হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন গত ৩৬ বছর ধরে কাব্যচিন্তার ক্ষেত্রে তিনি যে চিরন্তনের অনুসন্ধান করে যাচ্ছেন তা ধরা দিয়েছে তাঁর কাব্যগ্রন্থে গ্রন্থের বেশিরভাগ কবিতা তিনি রচনা করেছেন ১৯৯৮ সালে - হাসপাতালের বিছানায় শায়িত অবস্থায় তখন একটি জীবনঘাতি অস্ত্রোপচার হয়েছিল তার শরীরে
[
কবিতার সংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন:

মাহমুদ দারবীশকে মনে করা হয় আরব বিশ্বের কবিদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানীয় একজন এবং সমসাময়িকদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কবি কেউ কেউ মনে করেন জীবীত আরব কবিদের মধ্যে আডোনিসের পরেই তাঁর স্থা্‌ন তবে কাব্য চিন্তা সৃজনশীলতার ক্ষেত্রে অ্যাডোনিসের সঙ্গে তাঁর পার্থক্য অনেক বর্তমানে আরব কবিতায় যে আধুনিকতা দেখা যায় তা প্রধানত অ্যাডোনিসের হাত ধরেই এসেছে
অপরদিকে, আরবদের স্বাধীনতার প্রশ্নে, ফিলিস্তিনিদের ওপর দখলদার ইসরাইলীদের যে নিপীড়ন যুগ যুগ ধরে চলচ্ছে এসবের বিরুদ্ধে মাহমুদ দারবীশের কবিতার যে দৃঢ়তাপূর্ণ অবস্থান অ্যাডোনিসে তা অনুপস্থিত ফলে কাব্য জগতে তাঁর কর্ম পরিধির বিস্তৃতি অ্যাডোনিসের মতো এত বিশাল না হলেও বিশ্ব কাব্যমোদীদের কাছে তাঁর উপস্থিতি অনেক বেশি সরব সমপ্রতি একজন আরব সমালোচক লিখেছেন, মাহমুদ দারবীশ বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানীয় আরব কবিদের একজন কায়রো, বৈরুত, আলজেরিয়া, প্যারিস কিংবা লন্ডন যেখানেই তিনি উপস্থিত হন, কবিতা পড়েন সেখানেই প্রচুর লোক সমাগম ঘটে আরবী ভাষী বিশ্বে তাঁর কবিতা ব্যাপকভাবে পঠিত গীত যদিও তিনি ফিলিস্তিনে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন, তথাপি ইসরাইলের নাগরিত্ব তিনি ত্যাগ করেন নি তিনি কবিতায় তাঁর গ্রামের কথা বলেছেন যদিও ইসরাইলের সেনাবাহিনী ১৯৪৮ সালেই সেটি ইসরাইলের ম্যাপ থেকে মুছে দিয়েছে তবু কবিতা তাঁর যেন তাঁর গ্রামেরই ছবির কার্বন কপি পর্যন্ত ২৪ টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে তাঁর কবিতা
আরব ভাষায় মাহমুদ দারবীশের দখল দেখে কেউ কেউ বলেন যে, ভাষাই তাঁর রাজ্য এজন্য অপর একজন প্রখ্যাত আরব সমালোচক লিখেছেন, মাহমুদ দারবীশ হলেন আরবি ভাষার রক্ষাকর্তা তিনি কবিতায় যে সব প্রতীক, রূপক ব্যবহার করেন এসবের জন্য আলাদা সতর্কতা তাঁর থাকে এবং তাঁর রচনা শৈলীও স্বতন্ত্র| একই সঙ্গে নান্দনিকতায় উত্তীর্ণ সুদূর প্রসারি দৃষ্টির কারণে তাঁর কিছু কবিতকে বলা হয় ভবিষ্যৎ-প্রবক্তা এমন  শৈল্পীক প্রজ্ঞা এবং অসাধারণ রাজনৈতিক   চিন্তার সূক্ষ্ম ব্যবহার খুব কম কবির কবিতাতেই দেখা যায়  কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কখনোই ভাষার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ককে অনতিক্রম করে যেতে পারে নি তাঁর রয়েছে ভাষাকে শ্রুতিমধুর করার বিশেষ মেধা আরব বিশ্ব জুড়ে তাঁর কবিতা হয়ে উঠেছে সংগীত পিপাসুদের উর্বর ভূমি অনেক জনপ্রিয় চমৎকার সঙ্গীতও রচনা করেছেন তিনি প্রকৃতপক্ষে, তাঁর কবিতা সহজেই ভাষান্তরিত করা যায় এবং সুর দিয়ে গাওয়া যায় কিন্তু বলিষ্ঠ রাজনৈকিতক বক্তব্যই তাঁর কবিতার আসল শক্তি যেমন তিনি লিখেছেন,
...
এবং ইতিহাস কৌতূক করছে এর নিপীড়িত মানুষদের নিয়ে
এবং এর বীরদের নিয়ে
তাদের দিকে তাকাও একবার এবং চলে যাও এখান থেকে
এই সমুদ্র আমার
এই আদ্র বাতাস আমার
এবং আমার নাম-
যদি ভুল উচ্চারণেও কেউ লিখে দেয় আমার কফিনে
এটি আমারই।...

Darwish's poem My mother's translation

আমার মা

মায়ের হাতের রুটি খেতে আমার ইচ্ছে করে
আমার মায়ের হাতের কফি
তাঁর স্পর্শ
 শৈশবের স্মৃতি আমার ভেতরে মাথা চাড়া দেয়
দিনে পর দিন
আমি অবশ্যই নিজেকে সুযোগ্য করে তুলব
আমার মৃত্যুর সময়
যাতে আমার মায়ের চোখের পানি অর্থহীন না হয়ে যায়
এবং যদি কোনো একদিন আমি ফিরে আসি
একজন ছদ্মবেশী  হিসেবেই তুমি দেখো আমাকে
আর আমার হাড্ডীসার শরীর ঢেকে দিও ঘাসে
তোমার পায়ের ধূলোয় আশীর্বাদ করো
আর বেধে নিও তোমার সঙ্গে
তোমার চুলের কাঁটায়
আর সেই কাপড়ে যা তোমার পোশাক পেছন থেকে ঝুলিয়ে রাখে 
আমি অবশ্যই অমর হবো
হবো উপাস্য
যদি তোমার হৃদয়ের গভীরতা আমি স্পর্শ করতে পারি
যদি ফিরে আসি আমি -আমাকে তুমি
রান্না ঘরে কাঠ-লাকড়ির মতো ব্যবহার করো
ঘরের ছাদে কাপড় শুকোনোর দড়ির মতো ব্যবহার করো
তোমার দোয়া ছাড়া
দাঁড়াবার পক্ষে খুবই দুর্বল আমি
বৃদ্ধ আমি
কৈশোরের চাঞ্চল্য দিয়ে আমাকে তুমি উদ্দীপিত করো
তাহলেই আমি
মৌসুমি পাখিদের সঙ্গে একাই
পথের একটা রেখাচিত্র এঁকে নিতে পারব
তোমার অপেক্ষার ঘরে ফিরে আসার জন্য...

 (ইংরেজি অনুবাদ-ক্যারোলিন ফরচ মুনির আকাশ)






1 টি মন্তব্য :

rubiya বলেছেন...

gazi saiful islam is a prominent translator in Bangladesh. I always read his translation. Here Darwish's poems translation is very fine. Thanks him.
Rubiya jahan.